তিন অধিবেশনে সংসদ পরিচালনায় ব্যয় প্রায় ৭০৩ কোটি টাকা
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৭-০৯-২০২৬ ০২:৫৪:০৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৭-০৯-২০২৬ ০২:৫৪:০৯ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনে মোট ৬০ কার্যদিবস সংসদ পরিচালনায় প্রায় ৭০৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, সংসদের এক মিনিট অধিবেশন পরিচালনায় সরকারের গড় ব্যয় দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা।
তবে সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যয়ের তুলনায় সময় ব্যবহারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রথম তিন অধিবেশনে বিভিন্ন বিল পাস, প্রশ্নোত্তরসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও আইন প্রণয়নে তুলনামূলক কম সময় ব্যয় হয়েছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা, বাজেটের সাধারণ আলোচনা এবং বিভিন্ন বিতর্কে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়েছে।
এক প্রতিবেদনে প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানিয়েছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ গবেষণায় একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশনের হিসাবে প্রতি মিনিটে সংসদ পরিচালনার গড় ব্যয় ছিল ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করলে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি সেকেন্ডে সংসদ পরিচালনায় খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা।
৬০ কার্যদিবসে ব্যয় প্রায় ৭০৩ কোটি টাকা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ এবং শেষ হয় ৩০ এপ্রিল। এই অধিবেশনে ২৫ কার্যদিবস সংসদ বসে। এরপর দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন শুরু হয় ৭ জুন, যা চলে ১৫ জুলাই পর্যন্ত। এই অধিবেশনে কার্যদিবস ছিল ২৬টি।
তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় ২৭ আগস্ট এবং শেষ হয় ১০ সেপ্টেম্বর। এতে সংসদের কার্যদিবস ছিল নয়টি। সব মিলিয়ে প্রথম তিন অধিবেশনে ৬০ কার্যদিবস সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদ সচিবালয়ে অধিবেশন মোট কত ঘণ্টা চলেছে, তার সম্মিলিত হিসাব না থাকলেও অধিবেশন শুরুর ও শেষের সময় এবং বিভিন্ন বিরতি বিবেচনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট করে অধিবেশন চলেছে বলে হিসাব করা হয়েছে। এ হিসাবে তিন অধিবেশনে মোট প্রায় ৩২৮ ঘণ্টা ২০ মিনিট বা ১৯ হাজার ৭০০ মিনিট সংসদ অধিবেশন পরিচালিত হয়েছে।
প্রতি মিনিটে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা ব্যয় ধরে হিসাব করলে তিন অধিবেশনে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের আলোচনায় ব্যয় ৮৬ কোটি টাকা
চলতি বছরের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বর্ষ শুরুর ভাষণের ওপর আলোচনা হয় ৪০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট। এই আলোচনায় ২৮০ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন।
প্রতি মিনিটে সংসদ পরিচালনার গড় ব্যয়ের হিসাবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায়ই সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা বিক্ষোভ করে ভাষণ বর্জন করেন। পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনার জন্য ৫০ ঘণ্টা সময় বরাদ্দের প্রস্তাবও তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়।
বাজেট আলোচনাতেও শতকোটি টাকা ব্যয়
দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলে ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। এতে ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। মোট ২ হাজার ৯৩১ মিনিটের এই আলোচনায় সংসদ পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
তবে সংসদের সব ধরনের ব্যয়কে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশ্নোত্তর, আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম, বিভিন্ন নোটিশের নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক কাজ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংসদ রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এর পাশাপাশি দীর্ঘ বিতর্ক, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রমণ এবং অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের কারণেও সংসদের মূল্যবান সময় ব্যয় হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
আইন প্রণয়নে তুলনামূলক কম সময়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে করা ৯৩টি প্রশ্নের মধ্যে ৩৫টির উত্তর দেওয়া হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য পাওয়া ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস হয়। তৃতীয় অধিবেশনের নয় কার্যদিবসে পাস করা হয়েছে ছয়টি বিল। একই অধিবেশনে বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়।
তবে মাত্র নয় কার্যদিবসের তৃতীয় অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাসের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও দ্রুত বিল সংসদে পাঠানোর বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদ সদস্যদের বিলগুলো ভালোভাবে পড়া ও পর্যালোচনার সুযোগ দিতে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন।
বছরের পর বছর বাড়ছে সংসদ পরিচালনার ব্যয়
সময়ের সঙ্গে জাতীয় সংসদ পরিচালনার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। টিআইবির বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অষ্টম জাতীয় সংসদে প্রতি মিনিটে সংসদ পরিচালনায় ব্যয় ছিল প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। নবম সংসদের আটটি অধিবেশনে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজার টাকা।
দশম জাতীয় সংসদের ১৪তম থেকে ১৮তম অধিবেশনে প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা। এরপর একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনে প্রতি মিনিটে গড় পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের জন্য মোট ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ২৮৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণেও বিপুল ব্যয়
বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণেও প্রতিবছর বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। বিশেষ প্রকল্পসহ কোনো কোনো বছরে ভবনের ভৌত ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল রক্ষণাবেক্ষণে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে।
এর সঙ্গে নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা, সম্প্রচার, গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন এবং ওভারটাইমসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় যুক্ত হয়।
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন। বিলের প্রতিটি ধারা যথাযথভাবে পর্যালোচনা এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলে আরও কার্যকর ও টেকসই আইন প্রণয়ন সম্ভব।
জাতীয় সংসদের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, সংসদের বার্ষিক বাজেটকে শুধু অধিবেশনভিত্তিক ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, সম্প্রচার, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। তবে কোন দপ্তরে কত টাকা এবং কোন অধিবেশনে কত ব্যয় হচ্ছে, তার সমন্বিত হিসাব এখনো করা হয়নি।
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স